ঝিনাই নদী এখন মরা খাল, দখল-বর্জ্যে হারিয়েছে নাব্যতা
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১৯-০৪-২০২৬ ০৩:৩১:৫৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৯-০৪-২০২৬ ০৩:৫৭:৩৩ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ নদী ঝিনাইয়ের উৎপত্তি শেরপুরের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে। প্রচলিত রয়েছে এক সময় প্রচুর পরিমাণে ঝিনুক পাওয়া যেতে এই নদীতে। স্থানীয়রা ঝিনুককে বলতো ঝিনাই, আর এ কারণেই ‘ঝিনাই নদী’ নামেই পরিচিতি পায় নদীটি। তবে গত প্রায় এক দশক ধরে নদীটি তার চিরচেনা রূপ হারিয়েছে।
এক সময় স্রোতস্বীনি ঝিনাই নদীতে চলত ছোট-বড় নৌকা, ধরা পড়ত প্রচুর দেশীয় প্রজাতির মাছ। এখন নাব্যতা হারিয়ে স্রোতহীন নদীটি শুধুই কচুরীপানার স্তর। মাছ তো দূরের কথা অনেক জায়গায় তলদেশ ভারাট হয়ে যাওয়ায় নদীর বুকে চলছে চাষাবাদ। পাশাপাশি দখল ও দূষণের কবলে বিলীন হওয়ায় শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জামালপুর ও শেরপুর এই দুই জেলার সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের শেরপুর অংশে ঝিনাই নদীর উৎপত্তি। তবে নদীটি জামালপুর জেলার সদর উপজেলা ও মেলান্দহ উপজেলার সীমান্ত হয়ে সরিষাবাড়ী উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পার্শ্ববর্তী টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুর উপজেলায় যমুনা নদীতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। ঝিনাই নদীর দৈর্ঘ ১৩৩ কিলামিটার, গড় প্রস্থ প্রায় ৭৬ মিটার। গত এক দশক আগেও নদীটি বেশ স্রোতস্বীনি ছিল। উত্তরের ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে পানির স্রোত ঝিনাই নদী বয়ে নিয়ে যেত দক্ষিণের যমুনা নদীতে। ঝিনাই নদী দিয়ে ছোট-বড় পণ্যবাহী নৌযান চলত বিভিন্ন রুটে। স্থানীয়রা নদীর পানি দিয়ে চরাঞ্চলে চাষাবাদ ছাড়াও নদী থেকে প্রচুর মাছ আহরণ করত। প্রায় সব প্রজাতির দেশীয় মাছে ভরপুর ছিল নদীটি। বর্ষার সময় প্রতি বছরই নৌকা বাইচ হত ঝিনাই নদীতে। কিন্তু কালক্রমে ঝিনাই নদী তার যৌবন হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
ব্রহ্মপুত্র নদের ঝিনাইয়ের উৎসমুখ থেকে কিছুটা ভাটিতে জামালপুর পৌর এলাকার কম্পুপুর গ্রামে নদীর তীরে নির্মাণ করা হচ্ছে বর্জ্য শোধানাগার কেন্দ্র। কিন্তু শোধানাগারটির নির্মাণ কাজ শেষ না হলেও শহরের বর্জ্য নিয়ে আসা হয় এখানে। নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য রাখার কথা থাকলেও কয়েক বছর ধরে ঝিনাই নদীতে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। বর্জ্যরে স্তুপে নদীর এই অংশটি ভারাট হয়ে উঁচু হয়ে গেছে। একদিকে যেমন ভরাট হয়েছে নদী, অন্যদিকে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। বর্ষাকালে নদীর পানির স্রোত বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় পাশাপাশি ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে পড়ে পুরো নদীতে। এতে করে মাছসহ জলজ প্রাণী হুমকিতে পড়েছে। ময়লা-আবর্জনায় দূষিত নদীর পানি দিয়ে চাষাবাদ করা দুরুহ হয়ে পড়েছে, উর্বরতা হারাচ্ছে চরাঞ্চলের কৃষি জমি। এছাড়া বর্জ্যের দুর্গন্ধে এলাকাবাসী যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে, তেমনি মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে গোটা পরিবেশ।
নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হওয়ায় এখন নদীতে কোন স্রোত নেই, তাই দেখা যায় শুধুই কচুরিপানা স্তর। ঝিনাই তার নাব্যতা হারিয়ে ফেলায় নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। নদীর বুকে এখন ধানসহ নানা ফসল চাষ করা হয়। চাষাবাদের কারণে নদীটি কোথাও কোথাও সরু হয়ে খাল ও নর্দমার আকার ধারণ করেছে। দখলের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। নদী ভরাট করে নদীর তীরে গড়ে তোলা হচ্ছে ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ নানা স্থাপনা।
জামালপুর পৌর এলাকার হাটচন্দ্রা গ্রামের কৃষক জালাল মিয়া (৪৯) বলেন, ঝিনাই নদীর সেই সোনালী দিন এখন কেবলই স্মৃতি। আগে নদীর মাছেই আমাদের সবার পাত ভরে যেত, বাজারমুখী হতে হতো না কাউকে। এখন সেই নদী যেমন শুকিয়ে গেছে, তেমনি তার বুক থেকে হারিয়ে গেছে দেশি মাছ।
একই গ্রামের কৃষক আব্দুল রহিম (৫৫) বলেন, দশ বছর আগেও ঝিনাই নদীতে অনেক স্রোত ছিল, বড় বড় মাছ পাওয়া যেত আর ধুমধাম করে নৌকা বাইচ হতো। কিন্তু এখন নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নেই বললেই চলে। আগে নদী থেকে মেশিন দিয়ে সহজে জমিতে পানি দেওয়া যেত, এখন খরচ করে গভীর নলকূপ বসাতে হচ্ছে। নদীটা শুকিয়ে যাওয়ায় আমাদের আনন্দ আর সুবিধা দুটোই হারিয়ে গেছে।
মেলান্দহ উপজেলার মধ্যেরচর গ্রামের কৃষক হান্নান (৬০) বলেন, আমাদের ঝিনাই নদী আজ শুধু নামেই নদী, বাস্তবে কচুরিপানায় ঠাসা এক বদ্ধ জলাশয়। দুই বছর ধরে বন্যার পানি না আসায় নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, আর তার বিরূপ প্রভাবে ফসলে পোকা ধরছে। নদীটি দ্রুত খনন করা না হলে নৌকা চালানো বা দেশি মাছ পাওয়ার স্মৃতিগুলো চিরতরে হারিয়ে যাবে। আমরা আমাদের নদীকে আবার জীবন্ত দেখতে চাই।
জামালপুর পৌর এলাকার কম্পুপুর গ্রামের কৃষক কালু মুন্সি (৫০) বলেন, নদীর পাড়ে ডাস্টবিন দিয়েছে চাষের জমিতে। কোটি টাকা খরচ করে বড় আকারে ডাস্টবিন দিয়ে ভেতরে ময়লা ফেলে না, ময়লা ফেলে নদীতে। বন্যা হলেই কৃষকের জমিতে সব ময়লা চলে যায় এতে করে আমাদের ফলন কম হয়।
একই এলাকার রাসেল মাহমুদ (৪০) বলেন, কোটি কোটি টাকা খরচ করে ডাম্পিং স্টেশন দিয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট জায়গায় ময়লা না ফেলে নদীতে ফেলে। এই নদীতে মানুষ মাছ ধরে সংসার চালাত। কিন্তু ময়লা-আবর্জনা নদীতে ফেলার জন্য নদীর মাছ সব মরে গেছে। এখন পানিতে নামলে শরীরে চুলকানি রোগ হচ্ছে।
জামালপুর পৌরসভার প্রশাসক মৌসুমী খানম বলেন, বর্জ্য শোধানাগার কেন্দ্রের নির্ধারিত জায়গায় বর্জ্য ফেলার কথা। আর সেখানে যে পরিমাণ জায়গা নিয়ে ডাম্পিং স্টেশন তৈরি করা হয়েছে সেটা ভরতেই তো ৫০ বছর লাগবে। তারপরও যদি নদীতে বর্জ্য ফেলা হয়। তবে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।
জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নকিবুজ্জামান খান বলেন, ঝিনাই নদী খননের বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স